অবসাদ বা বিষন্নতার (ডিপ্রেশন) চিকিৎসায় এক ঐতিহাসিক সাফল্য সবার সামনে তুলে ধরলেন ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠান (আইআইটি) কানপুর এবং গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থী মেমোরিয়াল (জিএসভিএম) মেডিক্যাল কলেজের গবেষকরা। নতুন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাত্র ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই স্পষ্ট বোঝা যাবে, চিকিৎসকের দেওয়া অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট বা বিষন্নতার ওষুধটি রোগীর শরীরে আদৌ কাজ করছে কি না। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে একটি ওষুধ কার্যকর হচ্ছে কি না, তা বুঝতে প্রায় ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এখন গবেষকদের এই উদ্ভাবন দ্রুত সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে এবং রোগীদের দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট কমাতে এক নতুন দিক খুলে দিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ শতাংশ বয়স্ক মানুষ মারাত্মক বিষন্নতায় ভুগছেন। ভারতের প্রেক্ষাপটে এই হার প্রায় ৪.৫ শতাংশ। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিষন্নতায় আক্রান্ত অর্ধেকেরও বেশি রোগীর ক্ষেত্রে প্রথম দফায় দেওয়া ওষুধ সঠিক কাজ করে না। ফলে ওষুধ বদলে নতুন করে ট্রায়াল চালাতে গিয়ে মাসের পর মাস সময় নষ্ট হয় এবং রোগীর মানসিক অবস্থার আরও অবক্ষয় ঘটে। কানপুরের এই গবেষণা সেই জটিল সমস্যার এক আধুনিক সমাধান নিয়ে এসেছে।
গবেষণাপত্রটির মূল লেখিকা তথা আইআইটি কানপুরের কগনিটিভ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডঃ প্রগতি প্রিয়দর্শিনী বালাসুব্রহ্মণ্যম জানান, ‘চিকিৎসা শুরু করার মাত্র প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর অটুট এবং নন-ইনভেসিভ (দেহে অস্ত্রোপচার বা রক্তপাতহীন) বৈদ্যুতিক সংকেত থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মেলে। এই সংকেত বিশ্লেষণ করেই নিখুঁতভাবে বোঝা সম্ভব যে নির্দিষ্ট ওষুধটিতে কাজ হবে নাকি চিকিৎসা পদ্ধতি বদলানো প্রয়োজন।’
কীভাবে কাজ করে এই নতুন প্রযুক্তি এই সম্পর্কে বলতে গিয়ে গবেষকরা জানান, প্রধানত অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যকার যোগাযোগ অর্থাৎ ‘ব্রেন-গাট সিগন্যাল’ (Brain-Gut Signals) কাজে লাগিয়ে এই মডেল তৈরি করেছেন। এতে দুটি মূল পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়—
- ইইজি (EEG): মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিমাপের জন্য।
- ইজিজি (EGG): পাকস্থলী বা পেটের ভেতরের বৈদ্যুতিক তরঙ্গের গতিপ্রকৃতি পরিমাপের জন্য।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিষন্নতার লক্ষণভেদে ভিন্ন ভিন্ন রোগীর মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীতে বিশেষ কিছু বৈদ্যুতিক পরিবর্তন দেখা যায়।
গবেষণার প্রথম লেখক ও আইআইটি কানপুরের পিএইচডি গবেষক অমল জুড অশ্বিন ফ্রান্সিস জানান, ‘রোগীদের ভিন্ন লক্ষণ অনুযায়ী তাঁদের মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর শারীরবৃত্তীয় প্যাটার্নও আলাদা হয়। এই বায়োলজিক্যাল সাবটাইপ বা জৈবিক প্রকারভেদগুলি চিনতে পারার ফলেই বোঝা যায়, কেন একই ওষুধে দুজন রোগী দু’রকম প্রতিক্রিয়া দেখান। এর মাধ্যমে প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা বা ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা (Personalized Treatment) করা সম্ভব।’
পাশাপাশি এও জানানো হয়েছে, এই গবেষণায় মোট ২০৬ জন অংশগ্রহণকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১৪৪ জন ছিলেন একদম নতুন (ট্রিটমেন্ট-নাইভ) বিষন্নতার রোগী। চিকিৎসা শুরুর প্রথম দিন এবং তার ৭ থেকে ১০ দিন পর রোগীদের ইইজি এবং ইজিজি পরীক্ষা করা হয়। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিশেষ প্রেডিক্টিভ অ্যালগরিদম বা মডেল তৈরি করা হয়।
মডেলটি মূল্যায়নের সময় দেখা যায়, যেসব রোগীর ওপর ওষুধ কাজ করবে না, ৮৪ শতাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের সফলভাবে চিহ্নিত করা গেছে। পরবর্তীতে একদম স্বতন্ত্র একটি নতুন রোগীগোষ্ঠীর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, এই প্রযুক্তির সার্বিক নির্ভুলতার হার ৭৭.৩ শতাংশ।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখা শ্রেয়, গবেষণাগারের এই প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য উদ্যোগী হয়েছে ‘নিউরেক্লিনিক্যাল ইনোভেটিভ সলিউশনস‘ (NCIS) প্রাইভেট লিমিটেড। ভারত সরকারের বায়োটেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্স কাউন্সিল (BIRAC)-এর আর্থিক সহায়তায় খুব শীঘ্রই এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিক ও ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। যদিও বৃহৎ এবং বহুভিত্তিক আন্তর্জাতিক রোগীগোষ্ঠীর ওপর আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, তবুও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, আইআইটি কানপুরের এই নতুন দিশা ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসায় ট্রায়াল–অ্যান্ড–এরর প্রথা কাটিয়ে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

