শুভাশিস বিশ্বাস
চলে গেলেন মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। আক্ষরিক অর্থেই মণিহারা আজ বঙ্গ সাহিত্য জগত। পাঠকমহলে জনপ্রিয় ছিলেন সাহিত্যিক শংকর নামে। সাহিত্যিক শংকরের প্রয়াণে শোকজ্ঞাপন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
বিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে এই মণিশংকরের হাত ধরেই কলকাতাকে অন্যভাবে চিনতে শিখেছিল বাংলার পাঠকমহল। সালটা ১৯৫৫। যুবক বয়স থেকেই সাহিত্যচর্চার শুরু। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’। যেখানে মূল চরিত্রে উঠে আসেন কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মিলিটারি ডিউটিতে তিনি কলকাতায় আসেন এবং যথাসময়ে হাইকোর্টে আইনব্যবসা শুরু করেন। এই উপন্যাস আবর্তিত হয় মূলত ওই সময়ের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই। যা একদিন অচেনা থাকে, অজানা থাকে তাকেই আবার একদিন চিনে ফেলা যায়, জেনে ফেলা যায়।
ঘটনাচক্রে ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রিটের আদলতি কর্মক্ষেত্রও শংকরকে এমনি অসংখ্য অপরিচিত চরিত্রের সাক্ষাৎ সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল। সেদিন অচেনাকে চেনা আর অজানাকে জানাই ছিল তাঁর জীবিকার অপরিহার্য অঙ্গ। শুধু ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রিটের আদলতি কর্মক্ষেত্র নয়। তাঁর লেখায় ধরা পড়ে নানান ঘটনা যা জড়িয়ে ছিল কলকাতার পরতে পরতে। তাঁর এই উপন্যাস নিয়ে নাটক বানাতে চেয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। তবে তা অসমাপ্তই রয়ে যায়।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখা শ্রেয়, ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর অধুনা বাংলাদেশের যশোহর জেলায় জন্ম মণিশংকরের। আইনজীবী বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই কলকাতায় চলে আসেন। বসবাস করতে থাকেন হাওড়ায়। সেখানেই শংকরের বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আতঙ্কে জাপানি আক্রমণের ভয়ে পরিবার ফিরে গেল বনগাঁয়, কিন্তু কিশোর শংকর থেকে যান বাবার সঙ্গে। স্বাধীনতার বছরেই নেমে আসে জীবনের প্রথম বড় আঘাত—পিতৃবিয়োগ। সম্বলহীন এক কিশোরের সামনে তখন কঠিন বাস্তব। জীবিকার প্রয়োজনে কখনও অফিসের কেরানির কাজ, কখনও গৃহপরিচারক, এমনকি হকারিও করেছেন তিনি। এরই মাঝে চলে তাঁর সাহিত্য চর্চা। বাংলা সাহিত্যে একের পর এক অমর সৃষ্টি এই সময় থেকেই। শংকর কেবল জনপ্রিয় লেখক নন, নিজস্ব লেখনভঙ্গিও বারবার ভেঙেছেন তিনি।বিবেকানন্দের জীবন ও দর্শন নিয়ে লেখা তাঁর গ্রন্থগুলি দীর্ঘদিন বেস্টসেলার তালিকায় থেকেছে। ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও মানবজীবনের গভীর প্রশ্ন—সবেতেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। ভাষার সীমানা পেরিয়ে জনপ্রিয়তা খুব কম লেখকের ভাগ্যেই জোটে। অথচ বাংলা ভাষাতেই লিখে, একান্ত বাঙালি জীবনানুভব নিয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সর্বভারতীয় সাহিত্যিক শংকর।
তাঁর সৃষ্টির তালিকায় ১৯৫৫-র পর ১৯৬২-তে প্রকাশ পায় ‘চৌরঙ্গী’। স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে সাহেব পাড়াকে ভিন্ন ভাবে চেনাতে, দেখাতে শিখিয়ে ছিলেন তিনি। ‘চৌরঙ্গী’ প্রকাশের পর শংকর হয়ে উঠলেন পাঠকপ্রিয়তার এক অনন্য নাম। কলকাতার হোটেল-জীবনের অন্তরাল কাহিনি, মানুষের সাফল্য-ব্যর্থতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ভাঙনের গল্প, সব মিলিয়ে এই উপন্যাস তাঁকে এনে দেয় ব্যাপক জনপ্রিয়তা। আর তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুড়ি ভাগ করে নিয়েছিলেন পাঠকদের সঙ্গে আর সেই উপন্যাসও জায়গা করে নেয় চলচ্চিত্রতে। তাঁর আরও একটি অনবদ্য উপন্যাস হল ‘দ্য মিডলম্যান’ যা নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করেন স্বয়ং সত্যজিত রায়। ‘জন-অরণ্য’ নামে প্রকাশ পায় এই চলচ্চিত্র। এই কাহিনীতেই ফুটে ওঠে কীভাবে বেকারত্ব, নৈতিক অবক্ষয়ে আর দুর্নীতিতে বিপথে চালিত হয় এক শিক্ষিত যুবক। ব্যবসা করতে গিয়ে কীভাবে দুর্নীতির নাগপাশ জড়িয়ে ধরে এই উপন্যাস তথা চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রকে। ব্যবসা করার বদলে তিনি হয়ে যান ‘দালাল’। তাঁর এই উপন্যাসের মাধ্যমেই ফুটে ওঠে সেই সময় কলকাতার দুর্নীতি, অনৈতিকতা আর ঠিক-ভুলের হিসেব গুলিয়ে দেওয়া কঠোর বাস্তব। একইভাবে ‘সীমাবদ্ধ’-তেও ফুটে ওঠে সেই সময় মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত হয়ে ওঠার অসীম লোভ। সত্তরের দশকের অশান্ত কলকাতাকে কেন্দ্র করে লেখা স্থানীয় সংবাদ এবং সুবর্ণ সুযোগ—এই দুই উপন্যাস-সহ তিনটি রচনা নিয়ে আগে প্রকাশিত হয় জন্মভূমি উপন্যাস-সংগ্রহ। সম্প্রতি সেই সংকলনের ১০২তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে, যা তাঁর লেখার দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তারই প্রমাণ।
এই প্রসঙ্গে শঙ্কর সম্পর্কে আরও একটা কথা না বললে হয়তো কোনও কিছুই বলা হয় না, তা হল ২০২০ সালে তিনি সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার পান। ‘একা একা একাশি’- উপন্যাসের হাত ধরে আসে এই পুরস্কার। এর পাশাপাশি আরও এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, ২০১৯ সালে তাঁর প্রিয় শহর কলকাতার ‘শেরিফ’ পদপ্রাপ্তি। আর ২০১৮ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি লিট সম্মানও পান তিনি। এবার ২০২৬-এ এসে পথ চলা থামল কলকাতার কথকের। বাংলা ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তিনি থেকে গেলেন পাঠকের অন্তরে।

