নবান্ন অভিযানের ডাক চাকরিহারাদের। প্রথমে শিক্ষাকর্মী। এবার আসরে চাকরিহারা শিক্ষকরা। সোমবার বেশ কয়েকটি দাবিকে কেন্দ্র করেই রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক দপ্তর নবান্ন পর্যন্ত মিছিল করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন এই চাকরিহারা শিক্ষকরা। তাঁদের একটাই লক্ষ্য, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করা। আর সেখানেই তাঁরা দাবি জানাবেন, যোগ্যদের তালিকা দেওয়া হোক সুপ্রিম কোর্টে, বাকিদের পরীক্ষা নেওয়া হোক। এই দাবি নিয়েই এদিন ‘যোগ্য শিক্ষক–শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ’-র তরফে নবান্ন অভিযানের ডাক দেওয়া হয়।
মূলত, যোগ্য–অযোগ্য চাকরিহারাদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে ও রিভিউ পিটিশনের মাধ্যমে চাকরি ফিরিয়ে দিতে হবে, এই দুই দাবিতেই সোমবার পথে নামতে দেখা যায় ‘যোগ্য শিক্ষক–শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চের’ আন্দোলনকারীদের। এর পাশাপাশি এ দাবিও তোলা হয় যে, দেশের প্রধান বিচারপতির কাছে পৌঁছক রিভিউ পিটিশনের খসড়া। আর এই রিভিউ পিটিশন গ্রহণের জন্য সরকারকে সর্বতোভাবে চেষ্টা করতে হবে। সঙ্গে এ দাবি করা হয়, রিপ্যানেল বা পৃথকীকরণের মাধ্যমে ২২ লাখ ওএমআর প্রকাশ করতে হবে। এছাডা়ও রয়েছে, রিভিউ সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করা থেকে শুরু করে বৈধভাবে নিযুক্ত শিক্ষকদের স্বীকারোক্তি হলফনামা আকারে দেওয়ারও। সর্বোপরি ,পরীক্ষা এড়িয়ে সুপারনিউমেরারি পোস্ট তৈরি করে বৈধদের চাকরি বাঁচাতে হবে।
এদিকে এই চাকরিহারাজের এই অভিযান ঘিরে নবান্নের নিরাপত্তায় বজ্র আঁটুনি প্রশাসনের। নবান্ন সংলগ্ন গোটা এলাকায় সিসিটিভি এবং ড্রোন দিয়ে শুরু হয়েছিল নজরদারি শুরু হয়। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসানো হয় ব্যারিকেড। জিটি রোড, রামকৃষ্ণপুর ঘাট গেট, কাজিপাড়া মোড়, সাঁতরাগাছি প্রতিটি পয়েন্টে ছিল নজরদারি। মোতায়েন ছিল র্যাফ, দুটি জলকামান, ২৫টি করে হাই রেজোলিউশন ক্যামেরা ও কন্ট্রোল রুমে বসে সিসিটিভি–র মাধ্যমে নজরদারি চালান পুলিশ আধিকারিকরা। বিভিন্ন কমিশনারেট থেকে আনা হয় অতিরিক্ত ২,০০০ পুলিশ কর্মীও।
শুধু তাই নয়, আকাশছোঁয়া ব্যারিকেড ও গার্ডরেল বসিয়েছে পুলিশ। যার জেরে সংকীর্ণ হয়েছে যান চলাচলের রাস্তা। দেখা গিয়েছে, একেবারের রাস্তার উপরে এই গার্ড রেল বসিয়ে দেওয়া হয় এমন ভাবে যাতে আন্দোলনকারীরা কোনও ভাবে সেটিকে সরাতে না পারে। আর এদিন মল্লিক ফটকই যেন আজকের আন্দোলনের শেষ মাইলস্টোন। অর্থাত্ কোনও ভাবেই আর এগোনো যাবে না। নবান্ন পর্যন্ত। চাকরিহারা শিক্ষকদের রুখে দিল পুলিশি গার্ডরেল। বুঝিয়ে দিল শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের এটাই ‘লক্ষ্মণরেখা’।
এদিন হাওড়া ময়দান হয়ে মল্লিক ফটকের কাছে মিছিল ঢুকতেই ঢাল হয়ে দাঁড়ায় পুলিশ।রুখে দেওয়া হয় আন্দোলনকারী চাকরিহারা শিক্ষকদের। শুরু হয়, পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তিও। মিছিলের মাঝেই পুলিশি ব্যারিকেড ভাঙার হুঁশিয়ারি দেন এক চাকরিহারা শিক্ষক। বললেন, ‘আমরা নিজের যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছিলাম। আমাদের চাকরি নিয়ে কেন টানাটানি হচ্ছে। যারা দুর্নীতি করেছে, রাজ্য তাদের হয়ে আদালতে যাচ্ছে।’ রপরই তাঁদের সঙ্গে কথা বলার বার্তা আসে নবান্ন থেকে। এক চাকরিহারা শিক্ষক জানান, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে মুখ্যসচিবের সঙ্গে দেখা করছি। তবে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবই। আমরা বলব, যোগ্যদের তালিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যান, তাহলেই সবার চাকরি বাঁচবে। বাকিরা পরীক্ষা দিক।’
তবে নবান্ন নয়, শিবপুর পুলিশ লাইনে সরকার–চাকরিহারাদের বৈঠক। আর এই বৈঠকের মাঝপথে বেরিয়ে যান মুখ্যসচিব এবং রাজ্য পুলিশ প্রধান। সূত্রে খবর, বৈঠক শুরু হতেই ১০ মিনিটের মাথায় বের হন মুখ্যসচিব আর ৩৫ মিনিটের মাথায় রাজ্য পুলিশের ডিজি।বৈঠকে চাকরিহারাদের তরফ থেকে ছিলেন ২০ জনের প্রতিনিধি।
এরপর তিন ঘণ্টার বৈঠকের পরও কোনও সমাধানসূত্র মেলেনি। মুখ্যসচিব মনোজ পন্থের সঙ্গে বৈঠকেও মেলেনি রফাসূত্র। তবে এখনও নিজেদের দাবিতে অনড় চাকরিহারারা। মেহবুব মণ্ডল, চিন্ময় মণ্ডল–সহ আন্দোলনকারী চাকরিহারাদের দাবি, রাতের মধ্যে যোগ্য–অযোগ্যদের তালিকা প্রকাশ করতেই হবে। তাঁদের প্রশ্ন একটাই। তালিকা প্রকাশের নির্দেশ যেমন দেওয়া হয়নি। তেমনই প্রকাশে নিষেধাজ্ঞাও নেই। তাহলে কেন তালিকা তৈরি থাকা সত্ত্বেও কেন দেওয়া হচ্ছে না তা নিয়ে। যদিও কয়েকঘণ্টার মধ্যেই এই সিদ্ধান্তও বদল করেন চাকরিহারারা। জানা যাচ্ছে, আপাতত অবস্থানের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করছেন তাঁরা। সপ্তাহান্তে ফের পথে নামবেন। কালীঘাট যাবেন বলেও জানিয়েছেন চাকরিহারারা।