পাশ হয়ে গেল ওয়াকফ সংশোধনী বিল। লোকসভার পর রাজ্যসভাতেও পাশ হয়ে গেল ওয়াকফ সংশোধনী বিল। এই বিলের পক্ষে পড়ে ১২৮টি ভোট। বিপক্ষে ভোট পড়ে ৯৫টি। নতুন আইন প্রণয়ন হতে আর কোনও সমস্যা রইল না।এবার এই বিলে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু স্বাক্ষর করলেই তা আইনে পরিণত হবে।
বুধবার রাত ২টোয় লোকসভায় পাশ হয় ওয়াকফ সংশোধনী বিল। এই বিলের পক্ষে ২৮৮ জন সাংসদ ভোট দিয়েছিলেন, বিপক্ষে পড়েছিল ২৩২টি ভোট। পরের দিন, বৃহস্পতিবারই রাজ্য়সভায় এই বিল পেশ করা হয়। দুপুর ১টা থেকে ওয়াকফ বিল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ৮ ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ওয়াকফ সংশোধনী বিলের আলোচনার জন্য, কিন্তু সেই আলোচনা যখন শেষ হল, তখন ঘড়ির কাটা রাত ১টা পার করে গিয়েছে।
রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরণ রিজিজুর বক্তব্য দিয়েই আলোচনা শুরু হয়েছিল। বিতর্ক ছিল ওয়াকফ বোর্ড ও কাউন্সিলে অ–মুসলিম প্রতিনিধিত্ব নিয়ে। তিনি বলেন, “ওয়াকফ বোর্ড একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা। সমস্ত সরকারি সংস্থার ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া উচিত”। কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছে, ওয়াকফে ২২ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ৪ জন অ–মুসলিম প্রতিনিধি থাকবে।
এদিকে এদিন কংগ্রেস সহ বিরোধীদলগুলিকে আক্রমণ করে রিজিজু বলেন, ‘বিরোধীরা মুসলিমদের সমাজের মূলস্রোত থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। ৬০ বছর ধরে কংগ্রেস ও অন্যান্য দল দেশ শাসন করেছে, কিন্তু তারা মুসলিমদের জন্য কিছু করেনি। মুসলিমরা গরিব, এর জন্য দায়ী কে? আপনারা (কংগ্রেস)। মোদী সরকার এখন তাদের তুলে ধরার প্রচেষ্টা করছে।’
কী কী পরিবর্তন হবে ওয়াকফ আইনে?
রাষ্ট্রপতির সই পেলেই ওয়াকফ সংশোধনী বিল আইনে পরিণত হবে। নতুন আইনে–
ওয়াকফ বোর্ড চাইলেই কোনও সম্পত্তিকে ওয়াকফের সম্পত্তি বলে দাবি করতে পারবে না। জেলা কালেক্টর বা তার থেকে উচ্চপদস্থ কোনও কর্তা আগে খতিয়ে দেখবেন যে ওই জমি আদৌ ওয়াকফের কি না।
ওয়াকফে সম্পত্তি দানের নিয়মও বদলাবে। অন্তত পাঁচ বছর ইসলাম ধর্মাচরণ করলে তবেই ওয়াকফে ব্যক্তিগত সম্পত্তি দান করা যাবে।
মুসলিম মহিলাদের সম্পত্তিতে কোনও অধিকার ছিল না। এই সংশোধনী বিলে বলা হয়েছে, ওয়াকফে সম্পত্তি দানের আগে পরিবারের মহিলাদের তাদের নায্য উত্তরাধিকার দিতে হবে। বিশেষ ধারা রয়েছে বিধবা, বিবাহ বিচ্ছিন্না ও অনাথদের জন্য।
এবার থেকে রাজ্য ও কেন্দ্রের ওয়াকফ বোর্ডে অ–মুসলিম প্রতিনিধিত্ব থাকা বাধ্যতামূলক।
ওয়াকফ বোর্ডকে যে বাধ্যতামূলক অনুদান দিতে হত ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানগুলিকে, তাও ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
যে ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানগুলির আয় ১ লাখ টাকার উপরে, রাজ্য তাদের অডিট করবে।
ওয়াকফ সম্পত্তি ম্যানেজমেন্টের জন্য একটি কেন্দ্রীয় পোর্টাল চালু করা হবে।
তবে এই প্রসঙ্গে জেনে রাখা প্রয়োজন ওয়াকফ সম্পত্তি বতে ঠিক কী বোঝায। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা শ্রেয, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তিকেই ওয়াকফ সম্পত্তি বলা হয়, যা দলিলের মাধ্যমে আল্লাহর নামে করে দেওয়া হয়।সেই সম্পত্তি চ্যারিটির বা সেবার কাজে ব্যবহার করা হয়।নথি পত্রের যুগ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকে এই পদ্ধতি প্রচলিত আছে।
কারা ব্যবহার করে এই ওয়াকফ সম্পত্তি?
সাধারণত কোনও জনসেবার কাজে ব্যবহৃত হয় এই জমি। অথবা কেউ উত্তরসূরী হিসেবে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। এই সম্পত্তি কখনও হস্তান্তর করা যায় না। সাধারণত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কবর, মসজিদের জন্য, গরিব মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য জমি ব্যবহার করা হয়।
ওয়াকফ বোর্ড কী?
ওয়াকফ সম্পত্তির যাদের দায়িত্বে থাকে, আইনি ভাষায় তারাই ওয়াকফ বোর্ড। ১৯৬৪ সালে তৈরি হয় সেন্ট্রাল ওয়াকফ কাউন্সিল। দেশ জুড়ে ওয়াকফ বোর্ডগুলি এই কাউন্সিলের নজরদারিতে চলে। সম্পত্তি নিয়ে ওয়াকফ বোর্ড ছাড়াও রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গেও সম্পত্তির বিষয়ে কথা বলে এই কাউন্সিল। প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিতে পারে। ওয়াকফ বোর্ড কেমন কাজ করছে, তাদের ব্যাপারে অডিট রিপোর্টও তৈরি করতে পারে এই কাউন্সিল।
১৯৯৫ সালে একটি আইন তৈরি হয়, যা সংশোধন হয় ২০১৩ সালে। সেই আইনে ওয়াকফ বোর্ডকেই ক্ষমতা দেওয়া হয়, যাতে তারাই ওয়াকফ সম্পত্তি চিহ্নিত করতে পারে।