পার্থ মুখোপাধ্যায়
উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা নবজাগরণের এক নিরব শিখা জ্বলে উঠেছিল হুগলি নদীর ধারে শ্রীরামপুরে। ইংরেজ ধর্ম প্রচারক ও শিক্ষাবিদ উইলিয়াম কেরি, হান্না মার্কসম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ১৮০০ সালের ১০ই জানুয়ারি শ্রীরামপুরে এসে উপস্থিত হন। পরের দিন অর্থাৎ ১১ই জানুয়ারি ডেনিস গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে তাঁরা আশ্রয় এবং নিরাপত্তা পান। তারপর এখানেই তাঁরা বসবাস শুরু করেন।
খ্রিস্টান মিশনারি উইলিয়াম কেরি ভারতে আসার আগে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা মূলত উচ্চ সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাই কেরি সাহেব অনুভব করেছিলেন প্রাচ্য ও বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রয়োজন। তাই তিনি ৩৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে অলড্রিন হাউস গঠন করেছিলেন। কালের স্মরণী বেয়ে ঐতিহাসিক এই অলড্রিন হাউস এখন এক জতুগৃহে পরিণত হয়েছে। চারপাশে জলাকীর্ণ পরিবেশ, ঘাসে ঢেকে যাওয়া পথ, ভাঙা দরজা – জানালা আর অবহেলার চিহ্নে আচ্ছন্ন এক নীরবতা। স্থানীয়দের অভিযোগ এখানে এখন শুধু গাছপালা আর সাপ গোকুলের আস্তানা। একদিন যে বাড়ি থেকে বাংলা ভাষা শিক্ষা ও সংস্কৃতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল আজ তা পরিণত হয়েছে ইতিহাসের নিঃশব্দ ধ্বংসাবশেষে।
উইলিয়াম কেরির আদর্শের আশ্রয়ভূমি আজ অবহেলায় অযত্নে পরিণত হয়েছে জঙ্গলাকীর্ণ নিঃসঙ্গ অট্টালিকায়। একসময় যেখানে শিশুদের কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হতো পাঠের সুর আজ সেখানে বাজে বাতাসে হাহাকার।
অলড্রিন হাউজ কেবল একটি স্থাপনা নয় – এটি ছিল বাংলা শিক্ষার নবযাত্রা সূচনা বিন্দু। এখান থেকে উইলিয়াম কেরি এবং তার সহযোগীরা বাংলা ব্যাকরণ, অভিধান, বাইবেল অনুবাদ এবং বহু গ্রন্থ প্রকাশের কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিলেন। শ্রীরামপুর কলেজ এবং প্রেসের বীজ বপন হয়েছিল এখানেই। কিন্তু ইতিহাস আজ সেখানে ফিরে তাকালে কেবলই দেখবে অবহেলার শিকড়ে জড়ানো এক ঐতিহ্য।
উইলিয়াম কেরির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও ভাষা চর্চার প্রসার। তাই তিনি শ্রীরামপুর ও তার নিকটবর্তী অঞ্চলে ৬৭০৩ জন ছাত্র নিয়ে ১০৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন নারী সমাজকে শিক্ষিত করা খুবই প্রয়োজন। তাই তাঁর উৎসাহে তাঁরই সহযোগী হান্না মার্শম্যন বিভিন্ন স্থানে মেয়েদের জন্য অনেক অবৈতনিক স্কুল স্থাপন করেছিলেন।
শ্রীরামপুরের সংস্কৃতিপ্রেমী নাগরিক মহল এবং ইতিহাস গবেষকদের দাবি এই স্থাপনাটিকে অবিলম্বে সংরক্ষণ ও সংস্কার করা উচিত। প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের আওতায় এনে এখানে একটি স্মারক জাদুঘর স্থাপন করা যেতে পারে। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে বাংলা শিক্ষার নবযুগের সূচনা স্থলটি কেমন ছিল!
শুধু ইঁট পাথরের কাঠামো নয়- এটি বাংলা শিক্ষার আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক সাক্ষ্য। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক বিদেশী সাধক, যিনি আমাদের ভাষাকে বিশ্বে পৌঁছে দিয়েছিলেন। আজ সেই অলড্রিন হাউজ দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে – যারা প্রশ্ন করছে “আমার এই অরণ্যাবাস কি তবে তোমাদের ইতিহাসবোধের প্রতীক”?
আজ অলড্রিন হাউস দাঁড়িয়ে আছে শ্রীরামপুরে নিঃশব্দ কোণে, ঝরা পাতার মত কালের সাক্ষী হয়ে। যে প্রাঙ্গন একদিন শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিল, আজ সেখানে আলো ঢোকেনা। নিস্তব্ধতা, কুয়াশা আর প্রশ্ন ” উইলিয়াম কেরির অলড্রিন হাউসকে আমরা কি ভুলে যাব একেবারে?”
এই উত্তর খোঁজে চলেছে শ্রীরামপুরের আকাশ, নদী এবং স্থানীয় মানুষেরা। ইতিহাস আজ নিঃশব্দ অপেক্ষা করে পুনর্জন্মের।

