ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের চিকিৎসকরা মাত্র ৩২ সপ্তাহের প্রিম্যাচিউর নবজাতকের জীবন সফলভাবে রক্ষা করেছেন। নবজাতকটি একটি বিরল সমস্যায় ভুগছিল—পেটে অতিরিক্ত তরল জমা হওয়া (অ্যাসাইটিস) এবং তার সঙ্গে ছিল প্রাণঘাতী অন্ত্রছিদ্র (ইনটেস্টাইনাল পারফোরেশন)। এই ধরনের গুরুতর শারীরিক সমস্যা দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসের কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে শুধু নয়, পাশাপাশি মারাত্মক সংক্রমণের কারণ হতে পারে এবং অবিলম্বে চিকিৎসা না হলে প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শিশুটির ক্ষেত্রে এমন ঘটনা নজরে আশতেই ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের পেডিয়াট্রিক্স ও নিওনাটোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. সুমিতা সাহা-র নেতৃত্বে চিকিৎসক দল দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে দুটি জরুরি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করেন।
ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের তরফ থেকে এও জানানো হয়েছিল শিশুটির মা-ও উচ্চ রক্তচাপ এবং তীব্র পেটব্যথাসহ একাধিক জটিলতায় ভুগছিলেন। এই কারণেই ৩২ সপ্তাহে শিশুটির অকাল প্রসব করাতে হয়। জন্মের পরপরই শিশুটির পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং পেটে প্রচুর পরিমাণে তরল ও বায়ু জমে থাকায় তাকে ভেন্টিলেশনের সহায়তা দিতে হয়। দুই দিন পর শিশুটির অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। অন্ত্রে ছিদ্র হওয়ার ফলে শিশুর প্রথম মল এবং বায়ু পেটের গহ্বরে ছড়িয়ে পড়ে, যার কারণে পেটে মারাত্মক ফোলা ভাব সৃষ্টি হয় এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে শুরু করে। এরপর বিস্তারিত পরীক্ষায় দেখা যায়, অন্ত্র অস্বাভাবিকভাবে পাক খেয়ে গিয়েছিল এবং তাতে একটি ছিদ্র তৈরি হয়েছিল, যার ফলে অন্ত্রের ভেতরের উপাদান পেটের গহ্বরে বেরিয়ে আসছিল। শিশুটির অন্ত্রে সম্পূর্ণ ব্লকেজ এবং অন্ত্রে ছিদ্র থাকার কারণে মল, তরল ও বায়ু পেটের অংশে ছড়িয়ে পড়ছিল। তাই প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী একটি ল্যাপারোটমি অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকরা পেটের অংশ খুলে জমে থাকা উপাদান বের করে দেন, স্যালাইন দিয়ে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করেন, ছিদ্রটি মেরামত করেন, ব্লক হয়ে যাওয়া অন্ত্রের অংশ অপসারণ করেন এবং সুস্থ অংশগুলিকে পুনরায় যুক্ত করে ক্ষতস্থান বন্ধ করেন। প্রথম অস্ত্রোপচারের পর শিশুটির অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়।
এর চার দিন পর অন্ত্রে আবার একটি নতুন ছিদ্র তৈরি হয়, যার ফলে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করতে হয়। এতে পেটের অংশ পুনরায় খুলে আক্রান্ত এলাকা পরিষ্কার করা হয় এবং নতুন ছিদ্রটি মেরামত করা হয়। শিশুটি প্রায় ১০ দিন ভেন্টিলেটর সাপোর্টে ছিল এবং পরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়, যা এ ধরনের গুরুতর ক্ষেত্রে একটি সাধারণ জটিলতা। অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ এবং সংক্রমণের মতো সমস্যাগুলিও ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। তবে নিবিড় পর্যবেক্ষণ, সময়মতো অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ এবং উন্নত নবজাতক পরিচর্যার মাধ্যমে শিশুটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে এবং ৩৫ দিন পর স্থিতিশীল অবস্থায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পায়।
ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের পেডিয়াট্রিক্স ও নিওনাটোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. সুমিতা সাহা বলেন, ‘জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুটির পেট মারাত্মকভাবে ফুলে গিয়েছিল, যার ফলে ফুসফুসের উপর চাপ পড়ছিল এবং শ্বাস নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছিল। অবিলম্বে অস্ত্রোপচারই ছিল একমাত্র উপায়। চিকিৎসায় সামান্য দেরি হলেও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত কমে যেত। দ্রুত রোগ নির্ণয়, সময়মতো অস্ত্রোপচার এবং সমন্বিত আইসিইউ পরিচর্যাই শিশুটির জীবন রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।’
এর পাশাপাশি ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের ফ্যাসিলিটি ডিরেক্টর আশিস মুখোপাধ্যায় জানান, “উন্নত পরিকাঠামো এবং অত্যন্ত দক্ষ বহুমুখী বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তায় আমাদের চিকিৎসকরা সবচেয়ে জটিল ও উচ্চ–ঝুঁকিপূর্ণ নবজাতক রোগীদের চিকিৎসা দিতে সক্ষম। এই ঘটনাটি সংকটজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে হাসপাতালের প্রস্তুতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এমন সাফল্য আমাদের ক্লিনিক্যাল উৎকর্ষতা এবং রোগীকেন্দ্রিক পরিষেবার প্রতি অটল অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অসাধারণ সাফল্যের দৃষ্টান্ত। জটিল প্রসবের ক্ষেত্রে নবজাতক পরিচর্যার গুরুত্বকে এই ঘটনা আরও একবার তুলে ধরে এবং প্রমাণ করে যে দক্ষতা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে কঠিনতম পরিস্থিতিকেও সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।“

