মৌসমের হাত ধরে ঝড় তোলায় আশায় মালদহ

শুভাশিস বিশ্বাস

বঙ্গ রাজনীতিতে কংগ্রেসের দুর্গ বলে দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত ছিল মালদহ। তবে ছবিটা বদলায় ২০১১-এর পর থেকে। এদিকে মালদহের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে রাখতে হবে এখানকার প্রায় ৫১ শতাংশ মানুষ মুসলিম। এই কারণে ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস ও পরে তৃণমূল মালদহে শক্তিশালী, অন্তত ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের ফল তারই ইঙ্গিত দেয়। খুব স্পষ্টভাবে বলতে গেলে একসময় এই জেলা ছিল কংগ্রেসের গড়। ২০১১ সাল পর্যন্ত মালদায় দাঁত ফোটাতে পারেনি তৃণমূল। কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই কংগ্রেসে ভাঙন শুরু হয়। গোটা জেলায় ক্ষয়িষ্ণু হতে শুরু করে হাত শিবির। আর তৃণমূলের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল ধীরে ধীরে কংগ্রেসের ভোটব্যাংক দখল করে। এরপর ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপি এখানে সংগঠন বাড়িয়েছে ঠিকই, তবে সংখ্যালঘু সংখ্যাধিক্যের কারণে তারা এখনও তুলনামূলক দুর্বল। তবে এটাও ঠিক, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে যে ইঙ্গিত মিলছে তাতে মালদহের রাজনীতিতে যে একটা বড় পরিবর্তন আসার ইঙ্গিত মিলছে। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে মালদহ দক্ষিণ থেকে জয়ী হন কংগ্রেস প্রার্থী ইশা খান চৌধুরী। যেখানে কংগ্রেস প্রায় ৫.৭ লক্ষ ভোট। আর বিজেপি প্রায় ৪.৪ লক্ষ ভোট পেয়ে চলে আসে দ্বিতীয় স্থানে। সেখানে তৃণমূল চলে যায় একেবারে তৃতীয়ে। তাদের দখলে প্রায় ৩ লক্ষ ভোট।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা শ্রেয়, মালদহ জেলায় বিধানসভা কেন্দ্র মোট ১২টি । এর মধ্যে রয়েছে ৪৩- হাবিবপুর(তফসিল উপজাতি), ৪৪- গাজোল(তফসিলি জাতি), ৪৫- চাঁচল, ৪৬- হরিশ্চন্দ্রপুর, ৪৭- মালতীপুর, ৪৮- রতুয়া, ৪৯- মানিকচক, ৫০- মালদা(তফসিলি জাতি), ৫১- ইংলিশ বাজার, ৫২-মোথাবাড়ি, ৫৩- সুজাপুর,  ৫৪- বৈষ্ণবনগর। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে এই জেলায় তাদের ফল শূন্য৷  ১২ টি বিধানসভার মধ্যে ৫টি দখল করে বিজেপি আর ৭টি পায় তৃণমূল কংগ্রেস। নির্বাচনী ফলের বিশ্লেষণ করলে ২০২১-এ মালদহ এ জয়ী হন বিজেপির গোপাল চন্দ্র সাহা, হাবিবপুরে বিজেপির জোয়েল মুর্মু, গাজোলে বিজেপির চিন্ময় দেব বর্মণ, ইংলিশবাজারে বিজেপির শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী, বৈষ্ণবনগরে বিজেপির চন্দ্রনাথ সিনহা। অন্যদিকে চাঁচলে জয় পান তৃণমূল কংগ্রেসের নীহার রঞ্জন ঘোষ, হরিশ্চন্দ্রপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের তাজমুল হোসেন, মালতীপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের আব্দুর রহিম বক্সী, রতুয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের সমর মুখোপাধ্যায়, মানিকচকে তৃণমূল কংগ্রেসের সাবিত্রী মিত্র, মোথাবাড়িতে তৃণমূল কংগ্রেসের চৌধুরী সাবিনা ইয়াসমিন আর সুজাপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের আব্দুল খালেক। তবে তৃণমূলের এই জয়ের পিছনে নিঃসন্দেহে বড় অবদান ছিল বরকত পরিবারের মৌসম নুরের। তবে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে একটু একটু করে বদল হতে শুরু করে মালদহের রাজনৈতিক ছবিটা। শুরু হয় বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে দলবদল এবং পঞ্চায়েত দখলের লড়াই।  বিজেপি ছেড়ে যেমন অনেকেই যোগ দেন তৃণমূলে ঠিক তেমনই  মালদা জেলার এক নম্বর ব্লকের দেবীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত হাতছাড়া হয় তৃণমূলের। দখল নেয় বিজেপি। এদিকে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে এই মালদহ বাংলাদেশ লাগোয়া জেলা হওয়ায় বিজেপি অনুপ্রবেশ ও ধর্মীয় মেরুকরণের ইস্যু তুলে ভোটারদের টানতে চাইছে। আর উল্টোদিকে তৃণমূলের দাবি  বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করছে। তারা উন্নয়ন ও সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে ভোট ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তবে স্থানীয় ভোটাররা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে গুরুত্ব দেন স্থানীয় উন্নয়ন ও বাস্তব সমস্যার সমাধানকেই। এদিকে এসআইআর একটা বড় ফ্যাক্টর হতে চলেছে ২০২৬-এর মালদহের রাজনীতিতে। কারণ নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে,  ইতিমধ্যেই বাদ পড়েছে মালদহ জেলার ২ লক্ষ ৭ হাজার ৮২৭ জনের নাম। শতাংশের বিচারে তা ৬.৩১।

তবে গতবারের বিধানসভা নির্বাচন আর ২০২৬-এর নির্বাচনের ছবিটা মালদহে কিছুটা হলেও আলাদা। ছাব্বিশের নির্বাচনে সেই শূন্য থেকেই শুরু করতে চাইছে কংগ্রেস। তার জন্য দল তারুণ্যের উপর ভরসা করছে। তার প্রমাণ মিলেছে ২০২৫-এর প্রায় শেষদিকে ঘোষিত কংগ্রেসের নতুন জেলা কমিটিতে। যেখানে ৭৪ জনের কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছে ৪০ টি নতুন মুখ। সবচেয়ে বড় বিষয়, এঁদের মধ্যে বেশিরভাগ সদস্যেরই বয়স ৪০ বছরের মধ্যে। তবে নবীনদের পাশাপাশি কমিটিতে রয়েছেন প্রবীণরাও। এমনকি ৯২ বছর বয়সী আবু হাসেম খান চৌধুরীকেও কমিটিতে আমন্ত্রণমূলক সদস্য হিসাবে রাখা হয়। এরপর ২০২৫-এর প্রায় শেষভাগে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার মালদা সহ রাজ্যের কয়েকটি জেলার দলীয় কমিটি ঘোষণা করেন। ৭৪ জনের মালদহ জেলা কমিটিতে সভাপতি পদে বহাল রয়েছেন রাজ্যের একমাত্র কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরী। দুই সহ সভাপতি হয়েছেন প্রাক্তন দুই বিধায়ক মোত্তাকিন আলম ও আসিফ মেহবুব। সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন ৯ জন। এর মধ্যে পাঁচজনই নতুন। তাঁরা হলেন মতিউর রহমান, হাসনাৎ শেখ, ইন্দ্রনারায়ণ মজুমদার, জিয়াউর রহমান ও চিত্তরঞ্জন সাহা। ১২ জন জেলা সম্পাদকের মধ্যে নতুন মুখ সায়েম চৌধুরী, আতাউর রহমান, সিদ্ধার্থ সরকার, অসিত মণ্ডল, নায়েম চৌধুরী ও রঞ্জন সরকার। এভাবে প্রতিটি পদেই পুরোনোদের সঙ্গে নতুন কিছু মুখ ঢোকানো হয়েছে। এই প্রসঙ্গে জেলা কংগ্রেসের সহ সভাপতি মোত্তাকিন আলম জানান, ‘নতুন এই কমিটিতে নবীন ও প্রবীণদের মধ্যে যথেষ্ট ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে। কমিটিতে বর্ষীয়ান নেতাদের যেন রাখা হয়েছে, তেমনই নতুন প্রজন্মকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। এই ভারসাম্য আগামীতে এই জেলায় দলকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। দল আমাকে এই জেলায় সহ সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব পালনে আমার চেষ্টার কোনও ত্রুটি থাকবে না। ইশা খান চৌধুরীর নেতৃত্বে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে এই জেলায় দলের ফল যথেষ্ট ভালো হবে। গত বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই মালদায় দলের পুনরুত্থান শুরু হয়েছে। গত লোকসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে তার প্রমাণ মিলেছে৷ তৃণমূলের মোহ কাটিয়ে মানুষ আবার কংগ্রেসে ফিরে আসতে শুরু করেছে। আমরা খুব তাড়াতাড়ি জেলা কমিটির বৈঠক ডেকে আসন্ন বিধানসভা ভোটের রূপরেখা তৈরি করব।’

এদিকে মালদহের রাজনীতিতে এবার ঝড় তুলতে পারেন মৌসম নুর। ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে মোহভঙ্গ  ঘটেছে বরকত পরিবারের এই সদস্যের।  প্রত্যাবর্তন করেছেন পুরনো দলেই ৷ কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে যাওয়ার পর হতাশায় ডুবে গিয়েছিলেন হাত শিবিরের কর্মী থেকে শুরু করে সমর্থকরাও। যখন রাজ্য রাজনীতির মানচিত্র থেকে শতবর্ষ প্রাচীন দলটি অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে, তখন তাঁর দলত্যাগ মোটেই ভালোভাবে নেননি কংগ্রেসিরা ৷ পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী হিসাবে তাঁর কর্মক্ষমতা জেলা দেখেছে ৷ ঘাসফুল শিবিরের জেলা সভানেত্রী হয়ে একুশের ভোট পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর ও তাঁর সহযোগীদের তৈরি সেই নীল নকশায় যে কোনও ভুল ছিল না, একুশের নির্বাচনী ফলাফল তার প্রমাণ দিয়েছে। জেলার ১২টি আসনের মধ্যে প্রথমবার সাতটি আসন দখল করে ঘাস-ফুল শিবির। কিন্তু সেই নির্বাচনের পর হঠাৎ করেই তাঁর চেয়ার চলে যায়। তাঁকে রাজ্যসভার সাংসদ করে দিল্লি পাঠিয়ে দেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের একমাত্র কংগ্রেস প্রতিনিধি ছিলেন তাঁর দাদা। তবে রাজ্যসভার সাংসদ হয়ে লোকসভা কিংবা বিধানসভা নির্বাচন ভিত্তিক রাজনীতিতে তেমন কিছু করার থাকে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেক ৷ তাঁকেও আর সেভাবে পায়নি মালদহ জেলা। ফের চাঙ্গা জেলার কংগ্রেস নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সমর্থকরাও ৷ সঙ্গে সবাই এটাও চাইছেন, ছাব্বিশের নির্বাচনে  বরকত গনি খান চৌধুরীর উত্তরসূরীদের হাত ধরে আরও একবার জেলায় হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার করুক কংগ্রেস ৷ আবারও বিধানসভার সদস্য হন মৌসম। আর এবার সিপিআইএম ছাড়াই কংগ্রেস ভোটের ময়দানে নামছে।

তবে ‘একলা চলো’ নীতিতে প্রত্যয়ী মৌসম। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ছাব্বিশের নির্বাচন অবশ্যই পাখির চোখ। কংগ্রেসের নীতি, আদর্শ মেনে মানুষের কাছে থাকার কাজ করছি ৷ এরপর মানুষ তাঁদের রায় দেবেন। এর আগে বিভিন্ন নির্বাচনে সিপিআইএম-এর সঙ্গে কংগ্রেসের জোট হয়েছিল ৷ তাতে সমস্যা ছিল যে বঙ্গ রাজনীতির ময়দানে কংগ্রেসের ঠিক কী জায়গা রয়েছে তা বোঝা যাচ্ছিল না। কারণ, তাঁরা চান, সব জায়গায় যেন কংগ্রেসের পতাকা থাকে। এরপর প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বও বুঝতে পারে মালদহের মানুষ এখনও কংগ্রেসকে চাইছেন। ভালো সাড়াও মিলছে মানুষের কাছ থেকে। আর সর্বোপরি কংগ্রেস একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল। সেই আদর্শকে সামনে রেখে কংগ্রেস এগোনোর চেষ্টা করছে ৷ সেই কারণেই এবার একা লড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এখানেই মৌসমের ধারনা, এতে দলও মজবুত হবে। একইসঙ্গে একা লড়ে মানুষের কাছে কংগ্রেসের ইমেজ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারবেন তিনি।

পাশাপাশি মৌসম এও জানাতে ভোলেননি যখন তিনি তৃণমূলের জেলা সভানেত্রী ছিলেন তখন দল তাঁকে নির্বাচনের দায়িত্ব দিয়েছিল। সেই নির্বাচনে তৃণমূল ব্যাপক সাফল্য পায়। আর এই সাফল্য এসেছিল দলগত প্রচেষ্টায়। সবাই একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। ৷ তবে সব দলেই কিছু গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থাকে ৷ সেই দ্বন্দ্ব মিটিয়ে, নতুন ও পুরনোদের এক সুতোয় বেঁধে কাজ করার চেষ্টা করেন তিনি। আর মৌসমের এই ভাবনা  মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। এখন তিনি আবার কংগ্রেসে। এই দলের প্রতি তাঁর একটা পারিবারিক আবেগ কাজ করে। আর সেই কারণে দলে ফিরে এসে তিনি নিজের মতো করে সংগঠনটা মজবুত করার চেষ্টাও করছেন। কারণ, সেটা যে তাঁর কর্তব্য বলে মনে করেন মৌসম। আর সেটাই পালন করার চেষ্টা করছেনও তিনি।তবে পাশাপাশি মৌসম এটাও স্বীকার করে নিয়েছেন, কংগ্রেসের সবসময় প্রধান শত্রু বিজেপি। তবে বাংলায় অবশ্যই তৃণমূল। ফলে এবারের এই নির্বাচনী লড়াই  বিজেপি ও তৃণমূল, দুই দলের সঙ্গেই। পাশাপাশি আরও একটা অ্যাডভান্টেজ রয়েছে মৌসমের। কারণ, সদ্যই তিনি তৃণমূল থেকে এসেছেন। ফলে দলের অন্দরের অনেক খবর এবং হাল হকিকত জানেন তিনি। আর সবথেকে বড় ব্যাপার হল তিনি এই মালদহকে চেনেন হাতের তালুর মতোই। এলাকার মানুষ, যাঁরা কংগ্রেস করেন, যাঁরা তৃণমূল করেন, প্রত্যেককেই চেনেন তিনি। অন্য দলের লোকজন সম্পর্কেও তাঁর ধারণা স্পষ্ট।

এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারনা, ছাব্বিশের নির্বাচন মৌসমের কাছে বাস্তবিক অর্থেই অ্যাসিড টেস্ট। কারণ, তিনি রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে কংগ্রেসে ফেরে ফিরেছেন। ফলে এবারের নির্বাচনের ফলের উপর অনেকটাই নির্ভর করে আছে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + seventeen =