দেশে রেকর্ড হারে বাড়ল ফর্মাল ক্রেডিটের চাহিদা: চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট সিবিল-এর

বিগত এক দশকে দেশের সাধারণ মানুষের লেনদেন ও ঋণ নেওয়ার অভ্যাসে এসেছে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। নোট বাতিল, জিএসটি চালু এবং পরবর্তীকালে ‘ইউনিফাইড পেমেন্ট ইন্টারফেস’ (ইউপিআই)-এর বিপুল জনপ্রিয়তার হাত ধরে ভারতে আমূল বদলে গিয়েছে ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের থেকে ঋণ নেওয়ার চিত্র। কেন্দ্রীয় আর্থিক ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ এখন সরাসরি ফর্মাল ক্রেডিট বা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের আওতায় এসেছেন। ট্রান্সইউনিয়ন সিবিল-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট ‘আনলকিং অ্যাক্সেস: জার্নি অফ ক্রেডিট এক্সপ্যানশন ইন ইন্ডিয়া’-তে এমনই এক আশাব্যঞ্জক তথ্য সামনে এসেছে। ২০১৭ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত দীর্ঘ নয় বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি এই রিপোর্টে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ঋণ সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বেড়েছে তাঁদের সার্বিক অংশগ্রহণও।

দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে গ্রাহক সংখ্যা

রিপোর্টে প্রকাশ, ২০১৭ সালে দেশে ঋণ পাওয়ার যোগ্য সম্ভাব্য জনসংখ্যা ছিল ৭৯ কোটি। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ কোটিতে। সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে যাঁরা জীবনে অন্তত একবার হলেও ব্যাঙ্ক বা কোনও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের হার ২০১৭ সালের মার্চে ছিল মাত্র ৩৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে সেই সংখ্যাটা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে পৌঁছে গিয়েছে ৭৪ শতাংশে। অর্থাৎ বর্তমানে দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনও না কোনও সময় প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ গ্রহণ করেছেন।

পাশাপাশি, নিয়মিত ঋণ নেওয়া বা সক্রিয় ক্রেডিটের সঙ্গে যুক্ত থাকা গ্রাহকের হারও ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ শতাংশে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রথমবার ঋণ নিচ্ছেন এমন নতুন গ্রাহকের  সংখ্যা কিছুটা হলেও কমেছে। ২০১৭ সালের মার্চ প্রান্তিকে যেখানে নতুন ঋণগ্রহীতার হার ছিল ৩২ শতাংশ, ২০২৬-এর মার্চে তা নেমে এসেছে ১৩ শতাংশে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর অর্থ হল ব্যাঙ্কগুলি এখন শুধু নতুন গ্রাহক খোঁজার বদলে পুরনো গ্রাহকদেরই বেশি সুযোগ-সুবিধা দান করছে।

বদলেছে ঋণের ধরণ: জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও ব্যবসায়িক ঋণেই বেশি নজর

বিগত কয়েক বছরে ভারতীয়দের ঋণ নেওয়ার মানসিকতায় বড়সড় বদল এসেছে। আগে মানুষ মূলত জমি, বাড়ি বা গাড়ি কেনার মতো বড় সম্পত্তি বা অ্যাসেট তৈরি করতেই ঋণ নিতেন। কিন্তু বর্তমানে কেনাকাটা, নিজস্ব জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং ব্যবসা চালনা করার জন্য ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বহু গুণ বেড়েছে।

  • কনসেপ্ট ও লাইফস্টাইল ঋণ: ব্যক্তিগত ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও কনজিউমার ডিউরেবল লোনের মতো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ঋণ নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা বিপুল বেড়েছে। সক্রিয় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে এই ধরণের পণ্য ব্যবহারকারীর হার ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ শতাংশে
  • ব্যবসার কাজে ঋণ: খুচরো বা ছোট ব্যবসা চালানোর উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত ঋণ নেওয়ার হার রেকর্ড তৈরি করেছে। ২০১৭ সালে যেখানে মাত্র ৩ শতাংশ গ্রাহক ব্যবসার কাজে এই ঋণ নিতেন, ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশে। অর্থাৎ সংখ্যাটা প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • গাড়ির ঋণ ও সোনা বন্ধকী ঋণ: অন্যদিকে সোনা বন্দক রেখে ঋণ নেওয়ার হার ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে এবং গাড়ি ও ফ্ল্যাট কেনার ঋণের হার মোটের ওপর স্থিতিশীল রয়েছে।

গ্রামীণ ভারত, মহিলা এবং তরুণদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ

সিবিল-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ঋণের বাজারে প্রান্তিক ও অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর শ্রেণির অংশগ্রহণ আগের থেকে অনেক সুসংগঠিত হয়েছে।

১. মহিলাদের সংখ্যাবৃদ্ধি: ২০১৭ সালে মোট ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে মহিলাদের অবদান ছিল ২২ শতাংশ, ২০২৬ সালে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে হয়েছে ৩০ শতাংশ। অর্ধেকেরও বেশি অভিজ্ঞ মহিলা গ্রাহকের ঋণের ইতিহাস ৫ বছরের বেশি পুরনো।

২. তরুণ ও অনগ্রসর এলাকা: তরুণ ঋণগ্রহীতাদের হার ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৯ শতাংশ। এছাড়া মফস্বল, আধা-শহরাঞ্চল এবং একদম গ্রামের (SURU) গ্রাহকদের উপস্থিতি ৫৩ শতাংশ থেকে একলাফে বেড়ে ৬৩ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, তরুণ প্রজন্মের কাছে বাইক বা গাড়ির বদলে স্মার্টফোনই এখন তাদের কর্মসংস্থান এবং আয় বাড়ানোর মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

উত্তর ও মধ্য ভারতের জয়জয়কার: পিছিয়ে পড়ছে পশ্চিম ও দক্ষিণ

দেশের আর্থিক মানচিত্রেও এসেছে এক অভাবনীয় ভৌগোলিক পরিবর্তন। এতদিন ধরে ভারতের ঋণের বাজারে একচ্ছত্র প্রাধান্য ছিল মহারাষ্ট্র ও তামিলনাড়ুর মতো পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির। কিন্তু গত নয় বছরে উত্তর ও মধ্য ভারতের রাজ্যগুলিতে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের চাহিদা অভূতপূর্ব গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাজ্য

২০১৭ সালের অবদান

২০২৬ সালের অবদান

উত্তর প্রদেশ

%

১১%

মধ্য প্রদেশ

%

%

বিহার

%

%

পশ্চিমবঙ্গ

%

%

মহারাষ্ট্র

১২%

১০% (হ্রাস)

তামিলনাড়ু

১১%

% (হ্রাস)

অর্থনীতিবিদদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ এবং বিহারের মতো রাজ্যে আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পৌঁছানোর ফলেই এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।

এমএসএমই এবং ছোট ব্যবসায়ীদের বিরাট সুযোগ

শুধু ব্যক্তিগত কেনাকাটা নয়, বাণিজ্যিক বা বাণিজ্যিক সত্তার ক্ষেত্রেও ঋণের পরিধি বেড়েছে। দেশে বাণিজ্য ঋণের যোগ্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬.৩ কোটি থেকে বেড়ে ৮.৭ কোটি হয়েছে। যার মধ্যে প্রোপাইটারশিপ এবং পার্টনারশিপ ব্যবসার অংশ প্রায় ৮৮ শতাংশ। সরকারি ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের সাফল্যের কারণে কম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসার হার ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রয়েছে সতর্কতার বার্তাও

একদিকে যেমন গ্রাহকদের নিজেদের ক্রেডিট স্কোর বা সিবিল রিপোর্ট খতিয়ে দেখার হার নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে (২০১৮ সালের প্রায় শূন্য থেকে বেড়ে বর্তমানে ৩৫ শতাংশ), তেমনই আবার অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার একটি প্রবণতাও দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে অতিরিক্ত ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ার ফলে গত কয়েক বছরে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কড়াকড়ির কারণে ২০২৬ সালে তা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।

транসইউনিয়ন সিবিলএর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ভাবেশ জৈন এই বিষয়ে জানান, গত একটি দশক ভারতের আর্থিক ব্যবস্থার ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আগে যেখানে জামানত বা বন্ধক ছাড়া ঋণ পাওয়া দুষ্কর ছিল, আজ ডিজিটাল প্রযুক্তি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এর ফলেবিকশিত ভারত’-এর স্বপ্নপূরণে এক সুষম অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen − nine =