২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বর্ণঋণ বৃদ্ধি ৩.৮ গুণ

ভারতের খুচরা ঋণ বাজারে স্বর্ণঋণ এখন এক অভূতপূর্ব অবস্থানে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই খাতে প্রবৃদ্ধি এতটাই দ্রুত হয়েছে যে এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম খুচরা ঋণপণ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ট্রান্সইউনিয়ন সিবিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, স্বর্ণঋণের ব্যালেন্স ৩.৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং খুচরা ঋণ পোর্টফোলিওতে এর অংশীদারিত্ব ৫.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১.১ শতাংশ হয়েছে।

এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো ঋণের গড় টিকিট সাইজের বৃদ্ধি। ২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিকে যেখানে গড় ঋণ ছিল ভারতীয় মুদ্রায় ৯০,০০০ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে  ভারতীয় টাকায় ১.৯৬ লক্ষ টাকাতে। উৎপত্তি মূল্যও ৫.১ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বোঝা যায় যে বাজার শুধু বিস্তৃতই হচ্ছে না, বরং উচ্চমূল্যের ঋণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এর পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাদের প্রোফাইলেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। প্রাইম ও অ্যাবাভ প্রাইম গ্রাহকের সংখ্যা ২০২২ সালের ৪৩% থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ৫২ শতাংশ হয়েছে। নতুন ঋণগ্রহীতার অংশগ্রহণ কমে ১২ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ হয়েছে। মহিলাদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে মহিলারা মোট উৎপত্তির ৩৯% ভাগে পৌঁছেছেন। দক্ষিণ ভারতের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশে মহিলাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

এনবিএফসি এবং পাবলিক সেক্টর ব্যাংক উভয়ই স্বর্ণঋণ খাতে তাদের অংশীদারিত্ব বাড়িয়েছে। এনবিএফসির অংশীদারিত্ব ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ শতাংশ হয়েছে এবং পাবলিক সেক্টর ব্যাংকের অংশীদারিত্ব ৫৭% থেকে বেড়ে ৬২% হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে বাজারে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।

গড় ঋণগ্রহীতার বকেয়া ঋণ ২০২২ সালের ডিসেম্বরের  ভারতীয় টাকায় ১.৯ লক্ষ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ভারতীয় টাকায় ৩.১ লক্ষে পৌঁছেছে। ভারতীয় টাকায় ২.৫ লক্ষের বেশি ঋণভার থাকা ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে। এর ফলে বোঝা যায় যে স্বর্ণঋণ এখন অন্যান্য ঋণের পাশাপাশি পরিবারের সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠছে।

যদিও প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য, রিপোর্টে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত উৎপন্ন ঋণের মধ্যে ৬০ দিনের বেশি বকেয়া থাকা ঋণের হার ছিল ১.১%। উচ্চ ঋণভার থাকা গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি, ১.৫ শতাংশ। তাই ঋণদাতাদের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে ঋণগ্রহীতার সামগ্রিক ঋণভার, পরিশোধ ক্ষমতা ও ক্রেডিট আচরণকে আরও গভীরভাবে মূল্যায়ন করা।

এই প্রসঙ্গে ট্রান্সইউনিয়ন সিবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভাভেশ জৈন বলেছেন, “স্বর্ণ ভারতের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন আমরা দেখছি এটি একটি সংগঠিত ও মূলধারার ঋণপণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “ঋণদাতাদের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে প্রবৃদ্ধিকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা এবং ঝুঁকি শৃঙ্খলা বজায় রাখা।”

সুতরাং, ভারতে স্বর্ণঋণ আর শুধু স্বল্পমেয়াদি নগদ প্রয়োজন মেটানোর উপায় নয়, বরং এটি ক্রমশই পরিবারের সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠছে। তবে এই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই ও দায়িত্বশীল রাখতে হলে ঋণদাতাদের আরও সতর্ক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 + sixteen =