এক বিরল ও অত্যন্ত জটিল স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত অস্ত্রোপচারে ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের চিকিৎসকরা ৫১ বছর বয়সী এক মহিলার শরীর থেকে ১.৪১ কেজি ওজনের ফাইব্রয়েডে আক্রান্ত জরায়ু সফলভাবে অপসারণ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ঋতুস্রাবের কারণে তিনি গুরুতর রক্তাল্পতায় (অ্যানিমিয়া) ভুগছিলেন। রোগীর ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং পূর্বে একাধিক পেটের অস্ত্রোপচারের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও উন্নত রোবোটিক-সহায়তাপ্রাপ্ত হিস্টেরেকটমির মাধ্যমে সফলভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয় এবং মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই অস্ত্রোপচারের নেতৃত্ব দেন ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের সিনিয়র কনসালট্যান্ট গাইনোকোলজিস্ট ও রোবোটিক সার্জন ডা. সুজাতা দত্ত।
ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, এই চিকিতসা করতে আসার আগে প্রায় ছয় মাস ধরে রোগী অবিরাম ও অত্যধিক ঋতুস্রাবে ভুগছিলেন, যা ধীরে ধীরে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায় এবং দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করে। এর আগে তিনি অন্য একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, যেখানে হরমোন থেরাপি ও আয়রন ইনফিউশনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা নেওয়া হলেও কোনো উপকার পাননি। ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরে ভর্তি হওয়ার সময় তাঁর হিমোগ্লোবিনের মাত্রা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ৮ গ্রাম/ডেসিলিটার, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম এবং তাঁকে গুরুতর রক্তাল্পতা ও দুর্বলতার মধ্যে ফেলেছিল।
সঙ্গে রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও জটিল ছিল, কারণ তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন, তাঁর বিএমআই ছিল ৩০, অর্থাৎ তিনি স্থূলতায় ভুগছিলেন, এবং এর আগে তাঁর দুটি পেটের অস্ত্রোপচার হয়েছিল—একটি সিজারিয়ান সেকশন, যার ফলে পেটে বড় মাঝামাঝি দাগ ছিল, এবং অন্যটি ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে পিত্তথলি অপসারণের অস্ত্রোপচার। এই সমস্ত কারণ অস্ত্রোপচারকে অত্যন্ত জটিল করে তোলে এবং চিকিৎসকদের সামনে বড় ধরনের ক্লিনিক্যাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
এরপর ফোর্টিসে বিস্তারিত পরীক্ষায় রোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়। রোগীর জরায়ু প্রায় ২৬ সপ্তাহের গর্ভাবস্থার সমান বড় হয়ে গিয়েছিল এবং এর আকার ছিল আনুমানিক ২১ × ৯.২ × ১৭.২ সেন্টিমিটার। জরায়ুর ভেতরে একাধিক ফাইব্রয়েড ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টির আকার ছিল ১৩.৭ × ১০ সেন্টিমিটার। পাশাপাশি তাঁর অ্যাডেনোমায়োসিস ছিল, অর্থাৎ জরায়ুর অভ্যন্তরীণ আবরণী টিস্যু জরায়ুর পেশির ভেতরে প্রবেশ করে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এই অবস্থা চিকিৎসাহীন থাকলে অব্যাহত রক্তক্ষরণ তাঁর শারীরিক সক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সামগ্রিক জীবনমানকে আরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করত।
রোগীর সমস্ত রক্ষণশীল চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়া এবং উপসর্গের তীব্রতা বিবেচনা করে ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের চিকিৎসক দল রোবোটিক-সহায়তাপ্রাপ্ত টোটাল হিস্টেরেকটমি (সম্পূর্ণ জরায়ু অপসারণ) করার সিদ্ধান্ত নেন। একইসঙ্গে উভয় ফ্যালোপিয়ান টিউবও অপসারণ করা হয়। সন্তান ধারণের পর্ব সম্পন্ন হওয়া মহিলাদের ক্ষেত্রে জরায়ুর সঙ্গে ফ্যালোপিয়ান টিউব অপসারণ একটি স্বীকৃত চিকিৎসা-পদ্ধতি, কারণ এতে ভবিষ্যতে কিছু নির্দিষ্ট স্ত্রীরোগজনিত ক্যানসারের ঝুঁকি কমে। অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর ডিম্বাশয় পরীক্ষা করে সুস্থ পাওয়া যায়, তাই সেগুলি সংরক্ষণ করা হয়।
রোবোটিক হিস্টেরেকটমি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচারের সময় একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিশাল আকৃতির জরায়ুটি শরীর থেকে বের করা। জরায়ুর অস্বাভাবিক বড় আকারের কারণে সেটিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নাভির পোর্ট দিয়ে নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে বের করা হয়। পুরো অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকরা কিডনি থেকে মূত্রাশয়ে প্রস্রাব বহনকারী দুটি সূক্ষ্ম নালী, অর্থাৎ ইউরেটার, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শনাক্ত ও সুরক্ষিত রাখেন, যাতে কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়।
অস্ত্রোপচারটি আকার ও জটিলতার দিক থেকে অত্যন্ত কঠিন হলেও ফলাফল ছিল অত্যন্ত সফল। পুরো অস্ত্রোপচারের সময় রক্তক্ষয় ছিল খুবই কম। অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর হিমোগ্লোবিন ছিল ১০.৯ গ্রাম/ডেসিলিটার, আর পরে ছিল ১০.৬ গ্রাম/ডেসিলিটার, যা রোবোটিক প্রযুক্তির নিখুঁততারই প্রমাণ। অস্ত্রোপচারের পর তাঁর ব্যথা ছিল খুবই সামান্য, দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই স্থিতিশীল অবস্থায় হাসপাতাল থেকে ছুটি পান।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের সিনিয়র কনসালট্যান্ট গাইনোকোলজিস্ট ও রোবোটিক সার্জন ডা. সুজাতা দত্ত জানান, ‘এটি ছিল অত্যন্ত জটিল একটি অস্ত্রোপচার, কারণ রোগীর জরায়ুর ওজন ছিল ১.৪১ কেজি, যা সাধারণ হিস্টেরেকটমি অস্ত্রোপচারে দেখা গড় ওজনের প্রায় ছয় গুণ। তার ওপর রোগী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, স্থূলকায় এবং পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচারের কারণে শরীরের ভেতরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দাগের টিস্যু (স্কার টিস্যু) ছিল। এই ধরনের অস্ত্রোপচার সফল করার ক্ষেত্রে রোবোটিক প্রযুক্তির নিখুঁততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যেখানে সামান্য ভুলেরও সুযোগ থাকে না, সেখানে রোবোটিক প্রযুক্তি আমাদের এমন নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভুলতা দেয়, যা প্রচলিত অস্ত্রোপচারে অর্জন করা কঠিন। রোগীর রক্তক্ষয় খুবই কম হয়েছে, ব্যথাও ছিল সামান্য এবং তিনি মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই বাড়ি ফিরতে পেরেছেন। উন্নত সার্জিক্যাল চিকিৎসা ঠিক এমনই হওয়া উচিত।’
ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের ফ্যাসিলিটি ডিরেক্টর আশিস মুখোপাধ্যায় জানান, ‘এই ঘটনা প্রমাণ করে, যখন চিকিৎসকদের দক্ষতা, উন্নত প্রযুক্তি এবং রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা একসঙ্গে কাজ করে, তখন কী অসাধারণ ফলাফল সম্ভব হয়। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ একজন রোগীর ক্ষেত্রে ন্যূনতম আক্রমণাত্মক রোবোটিক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এমন সফল ফলাফল সত্যিই বিরল। এটি আমাদের সার্জিক্যাল দলের দক্ষতা এবং ফোর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের উন্নত চিকিৎসা–পরিকাঠামোর প্রতিফলন। আমাদের লক্ষ্য হলো, জটিলতম রোগের ক্ষেত্রেও যাতে রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য নিজের শহরের বাইরে যেতে না হয়।’

